
আমি Md. Mahin Mollah, এই গল্পের মাধ্যমে বর্তমান সমাজের এক জ্বলন্ত সমস্যা এবং আমাদের যুবসমাজের এক করুণ বাস্তবতাকে তুলে ধরেছি।
হৃদয় থেকে বলা কিছু কথা
মাহির ছিল সাধারণ ঘরের এক শান্ত ছেলে। তার দিন কাটত পড়াশোনা, টিউশনি আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়ে। সে ছিল একজন সত্যিকারের ইমানদার যুবক, যার কাছে সম্পর্কের পবিত্রতা ছিল ইবাদতের মতো। তার জীবনে ঝড়ের মতো এসেছিল জারা। মায়াবী চোখ আর মিষ্টি কথার জাদুতে জারা খুব দ্রুত মাহিরের মনে জায়গা করে নেয়।
মাহির জারাকে কোনোদিন কুনজরে দেখেনি। সে সবসময় চাইত জারাকে সম্মানের সাথে নিজের ঘরে তুলে নিতে। কিন্তু মাহির জানত না, সে যাকে ফেরেশতা ভাবছে, সেই জারা আসলে এক নিপুণ অভিনয়শিল্পী।
ছলনার জাল
জারা মাহিরের সামনে নিজেকে খুব অসহায় এবং ধার্মিক হিসেবে তুলে ধরত। মাহির তার টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে যারার সব আবদার পূরণ করত। জারা যখনই বলত তার খুব বিপদ, মাহির নিজের প্রয়োজনে খরচ না করে সেই টাকা জারাকে দিয়ে দিত।
কিন্তু পর্দার আড়ালে জারা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে কেবল মাহির নয়, আরও দুই-তিনজন ছেলের সাথে প্রেমের অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছিল। কেউ তাকে রিচার্জ করে দিত, কেউ দামি উপহার, আর মাহির দিত তার জীবনের সবটুকু আবেগ এবং বিশ্বাস। জারা ফোনে মাহিরের সাথে যখন কথা বলত, ঠিক তার কিছুক্ষণ পরেই অন্য ছেলের সাথে একইভাবে ভালোবাসার আলাপ জমাত।
নিষ্ঠুর সেই রাত
একদিন মাহির জারাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সে বলে, "জারা, আমি আমার পরিবারকে তোমার বাসায় পাঠাতে চাই। আমি আর এই লুকোচুরি পছন্দ করছি না।"
জারা সেদিন খুব অদ্ভুত আচরণ করল। সে হঠাৎ করেই মাহিরের ওপর চড়াও হয়ে বলল, "তোমার মতো একটা টিউশনি করা ছেলের সাথে আমি সংসার করব? তোমার আছেটা কী? আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি, আর আগামী সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে।"
মাহিরের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "জারা, তাহলে এতগুলো দিন তুমি আমার সাথে কিসের অভিনয় করলে? আমি তো তোমাকে আমার জীবন ভেবেছিলাম!"
জারা ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, "তুমি বড্ড বোকা মাহির। তোমার ইমানদারি আর নীতি কথা দিয়ে তো পেট ভরবে না। আমি যার সাথে প্রেম করছি, সে অনেক বড়লোক। তোমার মতো সাধারণ ছেলের সাথে সময় কাটানো যায়, জীবন কাটানো যায় না।"
বিয়ের মণ্ডপ ও ভাঙা হৃদয়
বিয়ের দিন মাহির নিজেকে সামলাতে পারছিল না। সে যারার বাসার সামনে গিয়ে দেখল, জারা খুব হাসিখুশি মুখে লাল বেনারসি পরে সেজেছে। সে যে ছেলের সাথে গাড়িতে উঠল, সেই ছেলেটি জারার বহুদিনের চেনা। মাহির বুঝতে পারল, জারা তাকে শুধু ব্যবহার করেছে যখন তার টাকা বা সময়ের প্রয়োজন ছিল।
জারা যখন হাসিমুখে বিদায় নিচ্ছিল, মাহির দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল তার পৃথিবীটা কীভাবে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সে কোনোদিন কোনো হারাম কাজে লিপ্ত হয়নি, কোনো মেয়ের অমর্যাদা করেনি—তবুও তাকে কেন এই কঠিন শাস্তি পেতে হলো?
মাহিরের নিঃসঙ্গ প্রহর
যারার বিয়ের পর থেকে মাহিরের আকাশটা যেন চিরতরে ধূসর হয়ে গিয়েছিল। চারপাশের হাসিখুশি মানুষগুলোকেও তার কাছে অচেনা মনে হতো। তার একাকীত্ব কেবল লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল না, বরং তার প্রতিটা নিঃশ্বাসে মিশে ছিল এক বিষাক্ত হাহাকার।
সেই চিরচেনা বারান্দা
প্রতিদিন বিকেলে মাহির তাদের বাসার ছোট্ট বারান্দায় এসে বসত। ঠিক এই সময়েই জারা তাকে ফোন করত। ফোনের স্ক্রিনটা এখন অন্ধকার থাকে, কিন্তু মাহিরের আঙুলগুলো অভ্যাসবশত বারবার সেই কন্টাক্ট লিস্টে চলে যায়। সে তাকিয়ে থাকে রাস্তার মোড়ের দিকে, যেখানে দাঁড়িয়ে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যারার প্রতীক্ষায় থাকত। এখন সেখানে শুধুই ধুলো ওড়ে, কেউ আর চঞ্চল পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসে না।
নির্ঘুম রাত ও জায়নামাজ
মাহিরের একাকীত্বের সবচেয়ে বড় সাক্ষী তার জায়নামাজ। মাঝরাতে যখন পুরো শহর ঘুমে বিভোর, মাহির তখন সেজদায় পড়ে অঝোরে কাঁদত। তার কান্নার কোনো শব্দ ছিল না, ছিল শুধু বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস। সে ভাবত,
"হে আল্লাহ, আমি তো তাকে ইমানের সাথে ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। আমি তো কোনো অপবিত্র কাজে লিপ্ত হইনি। তবে কেন আমার পবিত্র বিশ্বাসটা এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিল সে?"
সে যখন দোয়া করতে হাত তুলত, তখন তার চোখের জল হাতের তালুতে পড়ত। তার মনে হতো, এই পৃথিবীতে তার কথা শোনার মতো আর কেউ নেই। একাকীত্ব তাকে এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে, আয়নার সামনে দাঁড়ালে সে নিজেকেও চিনতে পারত না। তার চোখের নিচে কালি পড়ে গিয়েছিল, হাসতে সে ভুলেই গিয়েছিল।
স্মৃতির দহন
মাহিরের ঘরে রাখা ছোট ছোট জিনিসগুলো তাকে তাড়া করে ফিরত। একটা কলম, কিংবা একটা ডায়েরি—যাতে সে যারার জন্য কবিতা লিখত—সবকিছুই এখন বিষের মতো লাগে। মাঝে মাঝে সে ভুলে সেই ডায়েরিটা খুলে বসে, তারপর আবার বুকফাটা আর্তনাদে তা বন্ধ করে দেয়। তার একাকীত্ব তাকে মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বন্ধুদের আড্ডায় সে বসে থাকত ঠিকই, কিন্তু তার মন পড়ে থাকত সেই অতীতে, যেখানে তাকে নির্মমভাবে অপমান করা হয়েছিল।
নিঃশব্দ আর্তনাদ
মাহির এখন ভিড়ের মাঝেও একা। অফিসে কাজ করার সময় হঠাৎ করে কারও হাসি শুনলে তার মনে পড়ত যারার সেই তাচ্ছিল্যের হাসি। তখন সে দ্রুত বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে নিজেকে শান্ত করত। তার এই কষ্টটা কাউকে বোঝানোর মতো ছিল না, কারণ সে জানত মানুষ শুধু হাসাহাসি করবে।
সে একাই তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ সহ্য করে যেত। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে সে ভাবত, কাল সকালে যেন তাকে আর ঘুম থেকে উঠতে না হয়। কিন্তু পরক্ষণেই তার ইমান তাকে মনে করিয়ে দিত যে, এই পরীক্ষা আল্লাহর পক্ষ থেকে। সে একা, কিন্তু তার সাথে তার রব আছেন।
অমোঘ পরিণতি
কয়েক বছর কেটে গেল। মাহির অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়েছে। সে এখন অনেক বড় চাকরি করে, কিন্তু তার মন থেকে মানুষের প্রতি বিশ্বাস উঠে গেছে। সে এখনও রাতে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে বিচার চায়।
অন্যদিকে, জারা যে সুখের আশায় মাহিরকে ধোঁকা দিয়েছিল, তা বেশিদিন টেকেনি। সে যাকে বিয়ে করেছিল, সেই ছেলেটি ছিল একজন ঘোরতর অপরাধী এবং পরনারী আসক্ত। বিয়ের কয়েক মাস পরেই জারা জানতে পারে তার স্বামীও একইভাবে অনেক মেয়ের সাথে প্রতারণা করছে। জারার ওপর শুরু হয় অকথ্য নির্যাতন।
এক রাতে জারা যখন রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, তখন তার মনে পড়ল মাহিরের কথা। যে ছেলেটা তাকে ফুলের মতো আগলে রাখত, যার চোখের পানি সে হাসিমুখে অগ্রাহ্য করেছিল। জারা আজ বুঝতে পারছে, কারো পবিত্র আবেগ নিয়ে খেললে তার ফল কতটা ভয়াবহ হয়। সে আজ বিত্তবান ঠিকই, কিন্তু তার মনে একবিন্দু শান্তি নেই। প্রতিটি নিঃশ্বাসে সে মাহিরের সেই কান্নার প্রতিধ্বনি শুনতে পায়।
Gemini said
লেখক পরিচিতি
মোঃ মাহিন মোল্লাহ ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও লেখক
মোঃ মাহিন মোল্লাহ একজন পেশাদার ফ্রিল্যান্সার, এসইও (SEO) বিশেষজ্ঞ এবং কনটেন্ট রাইটার। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ এবং সমসাময়িক সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে লিখতে তিনি পছন্দ করেন। তার লেখনিতে ফুটে ওঠে বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য, ইমানি চেতনা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন।
পাবনা জেলার এই তরুণ লেখক বর্তমানে নিজের প্রযুক্তি বিষয়ক ব্লগ 'Mahin Ltd' পরিচালনা করছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কলমের আঁচড়ে সমাজের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরে তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া সম্ভব। 'বিশ্বাসের মরণ' গল্পটি তার এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে তিনি একজন ইমানদার যুবকের সরলতা এবং আধুনিক যুগের ছদ্মবেশী প্রতারণার এক জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।